দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। গত ৪ জুন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটিতে দেখা যায়, তিনি ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবির সঙ্গে দাবি করা হয়, কারামুক্তির পরপরই তিনি সেখানে যান এবং ‘ভিক্টোরি’ চিহ্ন প্রদর্শন করেন।
এমন দাবিতে প্রচারিত কয়েকটি ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে,এখানে,এখানে এবং এখানে।
তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, দাবিটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ছবিটি প্রথম প্রকাশ করে ‘Bengali Journal’ নামের একটি ফেসবুক পেজ। সেখানে ছবিটির ক্যাপশনে লেখা হয়, “কারামুক্তির পরদিনই ঐতিহাসিক ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে সাবেক মেয়র আইভী”। পরবর্তীতে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
‘Badda south thana’ নামের একটি ফেসবুক পেজ ছবিটি পোস্ট করে দাবি করে, “জামিন পেয়েই ধানমন্ডি বত্রিশ নাম্বারে উপস্থিত হয়ে সেখান থেকে স্বৈরাচার দোসর সেলিনা হায়াৎ আইভী ‘ভিক্টোরি’ সংকেতের মাধ্যমে মূলত সরকার তথা জুলাই আন্দোলনকারিদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন”।
অন্যদিকে, ‘Kona Ahmad’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি পোস্ট করে দাবি করা হয়, “জামিন পেয়েই ধানমন্ডি বত্রিশ নাম্বারে ভিক্টোরি দেখালেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তার নামে যারা মামলা করেছে তাদের বাড়িও বত্রিশ নাম্বারের মত করা হবে”।
তবে এসব দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। নির্ভরযোগ্য কোনো গণমাধ্যমে আইভীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর পরিদর্শনের খবর প্রকাশিত হয়নি। তার অফিসিয়াল বা ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টেও এ ধরনের কোনো ছবি বা তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং কারামুক্তির পর তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক পোস্টে দেখা যায়, তিনি মুক্তির পর রাতেই নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর কবরস্থানে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন।
প্রচারিত ছবিটির সত্যতা যাচাই করতে রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায়, ছবিটির মূল উৎস ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস। ওই সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৃতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আইভীর একটি ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, (১, ২) যার সঙ্গে বর্তমানে প্রচারিত ছবিটির মিল পাওয়া যায়।
এছাড়া ছবিটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পাদনা করা হয়েছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এআই শনাক্তকারী টুল Hive Moderation ছবিটিকে ৯৯.৯ শতাংশ সম্ভাবনায় এআই-সংশ্লিষ্ট বা এআই দ্বারা তৈরি/পরিবর্তিত হিসেবে শনাক্ত করেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ছবির একাধিক সংস্করণে গুগলের জেনারেটিভ এআই টুল ‘Gemini’ এর লোগোও দেখা গেছে। এসব তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ২০২২ সালের পুরোনো ছবিটি ব্যবহার করে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে আইভীকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।
হাইভ মডারেশন’র রেজাল্ট
অন্যদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথিত সংলাপ বা মন্তব্যের দাবির পক্ষেও কোনো গ্রহণযোগ্য সূত্র, ভিডিও, অডিও কিংবা সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বক্তব্যকে কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন বলেই প্রতীয়মান হয়।
সুতরাং, কারামুক্তির পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে সেলিনা হায়াত আইভীর উপস্থিতির দাবিতে প্রচারিত ছবিটি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদিত। একইসঙ্গে তার নামে প্রচারিত কথিত মন্তব্যগুলোরও কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি।